অসহায়দের সহায়তায় দানের আহ্বান

মাজারে নয়, দান হোক জীবিত মানুষের পাশে

সংবাদ ২৪ ঘন্টা প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২২ পিএম আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ এএম ২০ বার পঠিত
মাজারে নয়, দান হোক জীবিত মানুষের পাশে

মাজারে নয়, দান হোক জীবিত মানুষের পাশে

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০৬ সেপ্টে ২০২৬
মানুষের জন্য দান—এটি শুধু অর্থ দেওয়ার বিষয় নয়; এটি মানবিকতার প্রকাশ, বিবেকের দায় এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মহৎ সুযোগ। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই তাই আজ একটি প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই করা প্রয়োজন—দানবাক্সে জমা অর্থের প্রকৃত ব্যবহার কোথায় হওয়া উচিত? একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন, তখন তার পরিবারের চোখে থাকে অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তা। চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে কত পরিবার প্রিয়জনের চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। কারও হাতে ওষুধ কেনার টাকা নেই, কারও অস্ত্রোপচারের সামর্থ্য নেই, আবার কেউ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকুও নিতে পারেন না। সেই মুহূর্তে সামান্য আর্থিক সহায়তাও একজন মানুষের কাছে হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। অন্যদিকে আমরা অনেক সময় এমন স্থাপনা, সৌন্দর্যবর্ধন কিংবা আনুষঙ্গিক কাজে অর্থ ব্যয় করি, যেগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। ধর্মীয় স্থান, মাজার কিংবা ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যেখানে একদিকে একজন জীবিত মানুষ চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, অন্যদিকে সেখানে অর্থ ব্যয়ের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? মৃত মানুষের স্মৃতি আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করি। তার নামে স্থাপনা হতে পারে, স্মৃতিচিহ্ন থাকতে পারে, তার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু একজন জীবিত মানুষের জীবন রক্ষার সুযোগ যখন আমাদের সামনে উপস্থিত, তখন সেই জীবন রক্ষার চেয়ে বড় মানবিক কাজ আর কী হতে পারে? একটি দানবাক্সে মানুষ অর্থ রাখেন সওয়াবের আশায়, মানুষের কল্যাণের আশায়, ভালো কিছু করার প্রত্যাশায়। সেই অর্থ যদি কোনো অসহায় রোগীর ওষুধ কিনতে পারে, কোনো দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারে, কোনো শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে কিংবা কোনো মায়ের মুখে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে পারে—তাহলে সেই দানের অর্থ কি আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে না? আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মের মূল শিক্ষা কেবল স্থাপনা নির্মাণ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতি মমতা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা এবং একটি জীবন রক্ষার চেষ্টা—এসবও মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা মাজারের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্নটি আমাদের অগ্রাধিকারবোধ নিয়ে। প্রশ্নটি আমাদের বিবেকের কাছে। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মৃতের স্মৃতি রক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, অথচ জীবিত একজন মানুষ চিকিৎসার অভাবে ধুঁকবেন? যদি দানের উদ্দেশ্য হয় কল্যাণ, তবে সেই কল্যাণের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হতে পারে একজন অসহায় মানুষের জীবন। একটি জীবন বাঁচানো মানে শুধু একজন মানুষকে বাঁচানো নয়; তার সঙ্গে একটি পরিবারকে বাঁচানো, স্বপ্নকে বাঁচানো, ভালোবাসাকে বাঁচানো। মাজার থাকবে, স্মৃতি থাকবে, ইতিহাসও থাকবে। কিন্তু যে মানুষটি আজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বেঁচে থাকার আকুতি জানাচ্ছেন—তার জীবন ফিরে পাওয়ার সুযোগটি হয়তো আর কাল থাকবে না। তাই আসুন, দানের অর্থ কোথায় যাচ্ছে—সেই প্রশ্নের পাশাপাশি আমরা এটিও ভাবি, আমাদের দানের সুফল কতটা জীবিত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে? শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আমাদেরই। আর সেই সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটাই— মৃত মানুষের স্মৃতি রক্ষা, নাকি জীবিত মানুষের জীবন রক্ষা—কোনটিকে আমরা আগে রাখব? আপনার বিবেক কী বলে?

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।